বিখ্যাত গুণীশিল্পী সত্যজিৎ রায়

ভারতে বাংলা চলচ্চিত্রের বিখ্যাত শিল্পীদের মধ্যে সেরা ছিলেন সত্যজিৎ রায়। তিনি ছিলেন একজন ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা। তিনি বাংলা চলচ্চিত্র জগতের এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব তথা বিশ্ব চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠ চিত্রপরিচালকদের মধ্যে অন্যতম।
বিখ্যাত এই মহান ব্যক্তির জন্ম ২ মে, ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে (১৯ বৈশাখ, ১৩২৮ বঙ্গাব্দ)।তাঁর পূর্বপুরুষের ভিটা ছিল তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের কিশোরগঞ্জের (বর্তমানে বাংলাদেশ) কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া গ্রামে। তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় ১৯২৭ সালে। তিনি প্রথমে বালিগঞ্জ গভর্মেন্ট স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৪০ সালে সত্যজিৎ রায়ের মা তাঁকে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরপ্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে  পড়াশোনা করতে পীড়াপীড়ি করেন। অবশেষে মায়ের ইচ্ছায় সেখানে ভর্তি হন। শোনা যায়, তিনি সেখানকার পড়াশোনার পরিবেশ নিয়ে খুব একটা উঁচু ধারণা পোষণ করতেন না। কিন্তু সেখানে তিনি কিছুকাল পড়াশোনা করার পর তাঁর ধারণা পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত হয়। পরে তিনি স্বীকার করেন যে, সেখানকার বিখ্যাত চিত্রশিল্পী নন্দলাল বসু ও বিনোদবিহারীর কাছে তিনি অনেক কিছু শেখেন, যার ফলে তাঁর মনের প্রাচ্যে শিল্পের প্রতি গভীর আগ্রহ জন্মায়।
এই মহান ব্যক্তিত্বের বাবা বিখ্যাত কথাশিল্পী সুকুমার রায় ও মাতা সুপ্রভা রায়। তাঁর দাম্পত্য সঙ্গী ছিলেন বিজয়া রায়। তাঁদের দাম্পত্য জীবনে একটিমাত্র সন্তান ছিল, সেই সন্তানের নাম সন্দীপ রায়। তাঁর ঠাকুরদা ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী।
সত্যজিৎ রায় বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি চরিত্রের স্রষ্টা। একটি হলো প্রাতিজনিক গোয়েন্দা ফেলুদা, অন্যটি বিজ্ঞানী প্রফেসর শঙ্কু। এছাড়া তিনি প্রচুর ছোটোগল্প লিখেছেন। তাঁর লেখায় অনেক সময় ফেলুদাকে ধাঁধার সমাধান বের করে কোনো কেসের রহস্য উন্মোচন করতে হতো। ফেলুদার বিভিন্ন গল্পে তার সঙ্গী উপন্যাসলেখক জটায়ু (লালমোহন গাঙ্গুলি), আর তার খুড়তুতো ভাই তপেশরঞ্জন মিত্র ওরফে তোপসে ছিলেন গল্পের বর্ণনাকারী, যার ভূমিকা অনেকটা শার্লক হোমসের পার্শ্বচরিত্র ডক্টর ওয়াটসনের মতো। প্রফেসর শঙ্কুর বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিগুলো ডায়ারি আকারে লেখা, যে ডায়ারি বিজ্ঞানীটির রহস্যময় অন্তর্ধানের পর খুঁজে পাওয়া যায়। তাঁর লেখা অধিকাংশ চিত্রনাট্য ‘একশান’ সাহিত্যপত্রে বাংলায় প্রকাশিত হয়েছে।
সত্যজিৎ রায়ের মূল কর্মজীবন ছিল ১৯৫০–১৯৯২ সময়কালে। তিনি চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, গীতিকার, সংগীত পরিচালক, লিপিকলাবিদ, অঙ্কনশিল্পী ও লেখক ছিলেন। এ সময়ে তাঁর প্রতিভার প্রকাশ ঘটেছিল।
সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র সাধারণভাবে সমালোচকদের কাছ থেকে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেছে। তার মধ্যে অন্যতম পথের পাঁচালী। সত্যজিৎ রায়কে ভারতের অন্যতম সাংস্কৃতিক আইকন হিসেবে গণ্য করা হয়। ভারতীয় চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ওয়েস আন্ডারসন, মার্টিন স্কোরসেজি,জেমস আইভরি, ফ্রঁসোয়া ত্রুফোও, কার্লোস সরার মতো একাধিক বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা সত্যজিৎ রায় কর্তৃক অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।
সত্যজিৎ রায় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে এবং অন্যান্য দেশেও অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছিলেন। তাঁর পাওয়া পুরস্কারগুলোর মধ্যে ছিল ভারতের একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ১৯৯২ সালে ৬৪তম অ্যাকাডেমি পুরস্কার অনুষ্ঠানে প্রদত্ত একটি সাম্মানিক অ্যাকাডেমি পুরস্কার। ১৯৮৪ সালে সত্যজিৎ রায় ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মাননা দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার অর্জন করেন। এরপর ১৯৯২ সালে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারতরত্ন লাভ করেন।

অবশেষে প্রায় সত্তর বছর বয়সে ২৩ এপ্রিল, ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে (১০ বৈশাখ, ১৩৯৯ বঙ্গাব্দ) এই গুণী শিল্পী মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ছিলেন ভারতবর্ষের উজ্জ্বল নক্ষত্র, যাঁর হাত ধরে সেই সময় ভারতীয় সিনেমা বিশ্বদরবারে অনন্য মর্যাদা লাভ করে।

মোঃ নাজমুস সাকিব