ওজনের দিক দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে দামি মসলা জাফরান। ১ কেজি জাফরানের গড় দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা। জাফরান গাছের ফুল থেকেই জাফরান আঁশ সংগ্রহ করা হয়। আর ৪৫০ গ্রাম জাফরান তৈরির জন্য প্রায় ৭৫ হাজার ফুল প্রয়োজন। যে-কোনো মসলা সংগ্রহের পদ্ধতি থেকে জাফরান সংগ্রহ পদ্ধতি অনেকটা আলাদা। অল্প সময়ের মধ্যে দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে এই মসলা সংগ্রহ করতে হয়। মূলত জাফরানের চাষ এবং সংগ্রহ পদ্ধতির কারণেই জাফরান অনেক বেশি দামি।

জাফরান নামের এই অর্থকরী মসলাটি সাধারণত ‘জাফরান ক্রোকাস’ নামে পরিচিত। এর ইংরেজি নাম স্যাফরন (saffron)। বৈজ্ঞানিক নাম ক্রোকাস স্যাটিভাস (Crocus Sativus)। অত্যন্ত মূল্যবান হওয়ায় জাফরানকে বাণিজ্যিক অঙ্গনে বলা হয় লাল সোনা (red gold)।

জাফরান ফুলের প্রাণবন্ত গাঢ় লাল রঙের এবং শৈলীর গর্ভমুণ্ড, যাকে জাফরান আঁশ বলা হয়। এগুলোকে ইংরেজিতে বলে স্টিগমা। জাফরান আঁশ সংগ্রহ এবং শুকানোর মাধ্যমে জাফরান মশলা তৈরি করা হয় যা প্রধানত খাবারের স্বাদ এবং রঙের জন্য ব্যবহার করা হয়। আমাদের দেশে জাফরান মূলত ব্যবহার হয় জরদা নামের মিষ্টান্ন ও পায়েস তৈরিতে। বিরিয়ানির সুন্দর রং আনার জন্যও জাফরান ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও আরও অনেক খাবার তৈরির কাজেও এই জাফরানের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

জাফরান উদ্ভিদ বেশি জন্মে ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যে। এছাড়াও আফগানিস্তান, পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর, ইরান ও চীনে জাফরান চাষ হয়। এমনকি আমেরিকার কিছু এলাকাতেও জাফরানের চাষ হয়। আমেরিকায় যদিও জাফরান খাওয়ার তেমনটা রীতি নেই, তবে দামি মসলা বলে সেখানে জাফরানের কদর রয়েছে। ২০১৩ সালে আমেরিকা প্রায় ২৫ টন এবং ২০১৬ সালে প্রায় ৪৬ টন জাফরান আমদানি করেছে। বিশ্বে ইরানি জাফরানের ব্যাপক জনপ্রিয়তা আছে। বর্তমানে বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ৯০% অংশ ইরানে উৎপাদিত হচ্ছে। 

বাংলাদেশে কৃষি উন্নয়ন কপোরেশনের উদ্যোগে গাজীপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুর, পাবনা, রংপুর, খুলনা ও বান্দরবানে কিছু এলাকায় জাফরান চাষ স্বল্প পরিসরে শুরু হয়েছে। আমাদের বাংলাদেশে যে আবহাওয়া তা জাফরান চাষের জন্য অনুকূল বলেই মনে করেন উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ও কৃষিবিদরা।

ইতালি, ইরান আর স্পেন বিশ্বের সর্ববৃহৎ জাফরান উৎপাদনকারী দেশ হলেও ইরান একাই বিশ্বজুড়ে জাফরানের ৯০ শতাংশের জোগান দেয়। ইরানে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ জাফরান উৎপাদনের কারণ হচ্ছে সেখানে অল্প বেতনে অধিকসংখ্যক কর্মী পাওয়া যায়। ইরানের বেশির ভাগ এলাকায় কর্মীরা ফার্মে কাজে আসেন ভোর ৫-৬টার মধ্যে, এরপর প্রায় বিকেল ৪টা পর্যন্ত টানা তাদের কাজ করতে হয়। জাফরান সংগ্রহে নিয়োজিত বেশিরভাগই নারীকর্মী। তাদের সর্বোচ্চ বেতন দিনে ৫ ডলার। 

জাফরান চাষ এবং সংগ্রহ পদ্ধতি অত্যন্ত নিখুঁত। তাই এই কাজের জন্য দক্ষ শ্রমিক প্রয়োজন। ভারমন্ট ইউনিভার্সিটির পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট আরাশ গালেহগোলাব্বেহবাহানি বলেন, “জাফরান হচ্ছে ডিহাইড্রেটেড বা শুকনো গর্ভমুণ্ড। এটি ফুলের স্ত্রী অংশ। এই গর্ভমুণ্ডকেই আলাদা করে শুকিয়ে নিতে হয়। আর এসব পদ্ধতি সম্পন্ন করার জন্য শ্রমিকদের হাতের প্রয়োজন হয়।”

অনেক দেশেই (যেমন: আফগানিস্তান, মরক্কো) জাফরান ক্রোকাস ফুল সংগ্রহ করা হয় ভোরবেলায়, তা না হলে সূর্যের অতিরিক্ত তাপে ফুল নষ্ট হয়ে যায়। এই ফুল বছরে মাত্র একবারই চাষ করা যায়। প্রতিটি ফুলে মাত্র তিনটি সুতার মতো চিকন গর্ভমুণ্ড পাওয়া যায়। একবার গাছে ফুল এসে গেলে, ফুল থেকে জাফরান সরানোর কাজ শুরু করেন শ্রমিকরা। ১ পাউন্ড অর্থাৎ ০.৪৫ কেজি জাফরান সংগ্রহ করতে শ্রমিকদের প্রায় ৪০ ঘণ্টা সময় লাগে।

এই মসলা চাষ করা যে শুধু কঠিন তা-ই নয়, একা একা বড়ো হওয়াও এর জন্য বেশ বড়ো একটি চ্যালেঞ্জ। অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে ফুল ফোটে, ফুলের জন্য প্রয়োজন হয় প্রচুর রোদ, গরম আবহাওয়া আর পানি নিষ্কাশনের সঠিক ব্যবস্থা। ফুল তোলার পদ্ধতিটিও খুব সহজ নয়। মাটি থেকে মাত্র ছয় ইঞ্চি উচ্চতার হয় ফুলগুলো। এগুলো তোলার জন্য তাই শ্রমিককে ঝুঁকতে হয়। প্রায় ছয় ঘণ্টা বসে বা কুঁজো হয়ে ফুল তুলতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই এত দীর্ঘ সময় এই কাজ করা যে-কারো পক্ষেই কষ্টদায়ক। 

জাফরানের মূল্য বেশি হলেও এটি কি আসল না-কি নকল তা নিয়ে রয়েছে অনেক সংশয়। তবে আসল জাফরান চেনারও বেশকিছু উপায় আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাফরান আসল কি না সেটা জানা যায় এর গন্ধ থেকে। যদি জাফরানের ঘ্রাণ মিষ্টি আর স্বাদ তেতো হয়, তবে সেটি আসল জাফরান। এছাড়াও কয়েকটি জাফরান পানিতে ভিজিয়ে রেখে খেয়াল করুন সেগুলো রং ছেড়ে দিচ্ছে কি না। আসল জাফরান রং ছেড়ে দিলেও সেটি লালচেই থাকবে, কিন্তু নকল জাফরান সাদা হয়ে যাবে।

জাফরান ফুল দেখতে যেমন আকর্ষণীয় তেমনি আকর্ষণীয় এর সুগন্ধ। এই উদ্ভিদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর কোনো বীজ হয় না। বিস্ময়ের ব্যাপার যে, এর ফুল হয় অথচ বীজ হয় না । আর বীজ না হওয়ার কারণ হচ্ছে এই উদ্ভিদের দেহে কোন মিয়োসিস কোষ বিভাজন হয় না। আমরা জানি যে, পুং রেণু আর স্ত্রী রেণু তৈরি হয় মিয়োসিস কোষ বিভাজন দ্বারা। যেহেতু জাফরান উদ্ভিদের দেহে কখনই মিয়োসিস বিভাজন হয় না, সেহেতু পুং রেণু ও স্ত্রী রেণুও তৈরি হয় না। পুং রেণু ও স্ত্রী রেণুর মিলনেই বীজ তৈরি হয়। এই উদ্ভিদে পুং রেণু ও স্ত্রী রেণু সৃষ্টি হয় না বিধায় বীজও হয় না। আর এই জন্ম প্রক্রিয়ার জন্যও এরা এত মূল্যবান। 

বংশ বিস্তারের জন্য জাফরান উদ্ভিদ মানুষের সাহায্যের ওপর নির্ভর করে। চার বছর পর পর একটি জাফরান উদ্ভিদের মূলে টিউবার সৃষ্টি হয়। এগুলোর অন্য নাম ক্রোম। অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা খুব সাবধানে এগুলো সংগ্রহ করে তা রোপণ করেন যা থেকে পরবর্তী সময়ে নতুন জাফরান উদ্ভিদের জন্ম হয়। এ গাছ লম্বায় প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার হয়। রোপণের প্রথম বছর সাধারণত গাছে ফুল আসে না। একটি গাছ পরপর তিন থেকে চার বছর ফুল দেয়। জাফরান চাষ ব্যয়বহুল ও অত্যন্ত ধৈর্যের কাজ বিধায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষ এর চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

জাফরানের কিছু প্রকারভেদ রয়েছে। যেমন পদ্মাগদি (কাশ্মীরে জন্মানো এই জাফরানটিকে সর্বোত্তম প্রকারের জাফরান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একে মংরা বা লাছা জাফরানও বলা হয়), পারসিকা কুমকুমা (এর আঁশ বা সুতাগুলো অপেক্ষাকৃত বড়ো হয়ে থাকে), মধুগন্ধী (এর আঁশ বা সুতাগুলো ঘন ও পুরু হয়ে থাকে। এ ছাড়া এগুলো রুক্ষ এবং কিছুটা সাদা হয়), বাহিলকা (এর আঁশ বা সুতাগুলো ছোটো ও সাদা হয়)। এছাড়াও আছে সারগোল (ইরানে জন্মায়), আকিলা (ইতালিতে জন্মায়) এবং ক্রিম (স্পেনে জন্মায়)।

জাফরানের উপকারিতাও রয়েছে ব্যাপক। এটি স্বাস্থ্যের জন্যও অনেক উপকারী। এটি গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা ও অন্যান্য অনেক শারীরিক সমস্যা নির্মূলে ঔষধি হিসেবে কাজ করে থাকে। এর ভেষজ গুণ এতই সমৃদ্ধ যে, এটি মানবদেহে অন্তত ১৫টি সমস্যা দূর করতে সক্ষম। ভিটামিন এ, বি, সি, জিংক, পটাসিয়াম ও সোডিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পাওয়া যায় জাফরান থেকে। খাবারে চমৎকার ফ্লেভার যোগ করে জাফরান। ত্বকের যত্নেও এটি অনন্য। রূপচর্চায় ব্যবহৃত হয় জাফরান। এটি ত্বককে উজ্জ্বল করে এবং অবসাদের চিহ্ন দূর করে ত্বককে সতেজ ও সজীব করে তোলে। এ ছাড়াও জাফরান স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। প্রতিদিন এক চিমটি জাফরান দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে হরমোন উদ্দীপিত হয়। ঠান্ডা লাগা ও জ্বরের হাত থেকে বাঁচায় জাফরান। জাফরানে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্‌পিণ্ডের সমস্যা দূর হয়। হজমজনিত সমস্যা নিরাময়ে জাফরান প্রয়োগের নজির আছে। পরিমাণমতো জাফরান নিয়মিত খেলে ফুসফুসের বিভিন্ন রোগ দূর হয়ে যায়। অনিদ্রা দূর করে জাফরান। যে কোন ধরনের ব্যথা নিরাময়ে জাফরান অত্যন্ত কার্যকরী। স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তি বৃদ্ধিতেও এটি বেশ সহায়ক।

ইসলাম ধর্মে জাফরান খাওয়া বৈধ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে জাফরানের বেশি ব্যবহার ছিল পোশাকের ক্ষেত্রে। ইসলামে পুরুষের জন্য জাফরান রঙের পোশাক নিষিদ্ধ করেছে। তবে নারীদের জন্য তা নিষিদ্ধ নয়। আনাস (রা.) বলেন, “নবি (সা.) পুরুষদের জাফরানি রঙের কাপড় পরতে নিষেধ করেছেন।” (বুখারি, হাদিস : ৫৮৪৬)

এছাড়া সুগন্ধি হিসেবেও জাফরান খুব উল্লেখযোগ্য। আতর ও সুগন্ধি বিষয়ে ইসলামের মূলনীতির আলোকে ইসলামি আইনবিদরা বলেছেন, সুগন্ধি হিসেবে জাফরান ব্যবহার করা পুরুষের জন্য বৈধ।