একজন বাংলাদেশির গুগল জয়যাত্রা

Must read

ন্যাশনাল নিউজপেপার অলিম্পিয়াড (এনএনও) এর আয়োজনে ২০ এপ্রিল,২০২০-এ অতিথি হিসেবে যুক্ত ছিলেন গুগলে নিযুক্ত একমাত্র বাংলাদেশী প্রিন্সিপাল ইঞ্জিনিয়ার এবং পরিচালক জাহিদ সবুর। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন নুসরাত সায়েম।

প্রশ্নোত্তর পর্ব:

এনএনও: বাংলাদেশ থেকে গুগলে যাওয়ার যাত্রাটি কেমন ছিল এবং মহামারির এই সময়টিতে কেমন চলছে?

জাহিদ সবুর : যেহেতু মহামারির কথা এসেছে সেহেতু এটা নিয়ে শুরু করছি, করোনাভাইরাস আমাদের সবাইকে প্রভাবিত করছে। আমার আসলে গত দুই মাসের বেশি হয়ে গেছে বাসায় থেকে কাজ করছি। যদিও কাজের পরিমাণ কমেনি বরং তা আগের থেকে অনেক বেড়ে গেছে। যখন অফিসে থেকে কাজগুলো করতে হতো তখন আরও সহজ ছিল, মানুষের সাথে সামনাসামনি কথা বলে কাজ করা সম্ভব হতো। তবে করোনার এই ভয়াবহ প্রভাব নিয়ে যদি আমরা সারাক্ষণ চিন্তা করতে থাকি সেটা কিন্তু মানসিকভাবে মোটেও ভালো হবে না। সেদিক থেকে আমি বলব যে এই ব্যস্ততা বা কাজটা আমার জন্য আশীর্বাদস্বরূপ আমাকে সাহায্য করছে এ ভয়াবহ ব্যাপারগুলো থেকে দূরে থাকতে। আর বাংলাদেশ থেকে গুগলে যাওয়া আসলে অনেক লম্বা একটা অভিজ্ঞতা। এটা আপনি আমাকে সাজেস্ট করলে ভালো হতো আমি কোথা থেকে সংক্ষেপে শুরু করতে পারি।

এনএনও: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো একটি খুদেবার্তার মাধ্যমে যখন আপনি জানলেন আপনি গুগলের ইঞ্জিনিয়ার অথবা ডিরেক্টর পদে পদোন্নতি পেয়েছেন বা আপনাকে সেই পদটি দেওয়ার জন্য তাঁরা প্রস্তুত, সেই সময় আপনার অনুভূতি কেমন ছিল?

জাহিদ সবুর : আসলে দুটি ব্যাপার আছে প্রথমটি হলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। নানান কারণে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারিনি। পারিবারিক কারণে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব ছিল না। পরীক্ষা দিতে হলে একটা নির্দিষ্ট যোগ্যতা থাকতে হয়, সে নির্দিষ্ট যোগ্যতাও আমার ছিল না। আমি পড়ালেখায় খারাপ স্টুডেন্ট ছিলাম এটা অনেকে ভাবতে পারেন, কিন্তু না। আমি সবসময়ই ভালো স্টুডেন্ট ছিলাম। কিন্তু একটা পারিবারিক দুর্ঘটনার কারণে আমার সে যোগ্যতা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। তখন আমার একমাত্র উপায় ছিল যে, অন্য কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যদি আমাকে ভর্তি হওয়ার সুযোগ দেয়। সে সুযোগটা আমি পাই এআইইউবি মাধ্যমে পাই। সেখানে গিয়ে আমার প্রথম লক্ষ্যটা ছিল আমি যদি একটা ভালো রেজাল্ট করি তাহলে হয়তো আমি একটা স্কলারশিপ পাব কারণ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা করা যথেষ্ট ব্যয়সাপেক্ষ। আমি চাইনি সেই ব্যয় আমার পরিবারের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়াক। সেই কারণেই তারা সবসময় চেষ্টা করেছি ভালোভাবে পড়াশোনা করার। পড়াশোনা ব্যাপারে আমার আসলে যে জিনিসটা ভালো লাগতো সেটা হচ্ছে প্রোগ্রামিং। আমি সেকেন্ড ইয়ারে থাকতে প্রোগ্রামিং শুরু করি এর আগে আমি কখনও প্রোগ্রামিং করিনি। যখন আমি প্রবলেম করা শুরু করি তখন আবার কিছু বিষয়ে কথা শুনতে হয়েছে। অনেকেই বলেছেন, তুমি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রোগ্রামিং কন্টেস্টে এরকম ভালো করা সম্ভব না। কতদূরই বা করতে পারবে কীইবা করতে পারবে? তারপরও আমার মধ্যে একটা জেদ চেপে যায়, দেখি কী করা যায়। আমার সাধ্য মতো করে যেতে থাকি। সবচেয়ে বড়ো সুবিধা আমি যেটা বলবো, ইন্টারনেটের জন্য কম্পিউটারের মাধ্যমে কিন্তু আপনি আপনার যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেন। আমার বিশ্ববিদ্যালয় থার্ড ইয়ার ফোর্থ ইয়ার দুই বছরে তখনকার সবচেয়ে জনপ্রিয় অনলাইন প্রোগ্রামিং কনটেস্ট হতো, আমি সেখানে ছিলাম। সেখানে তাদের একটি বাৎসরিক অনলাইন র‍্যাংকিং প্রকাশিত হতো। দু’বছই আমি সেই কোম্বাইন র‍্যাংকলিস্টে বাংলাদেশের সব থেকে ওপরে ছিলাম। পরিশ্রম করলে যে সব সময় ফলাফল পাওয়া যায় এমন কিছু না। কিছু প্রোগ্রামিং কনটেস্টে একদম শেষ পর্যায়ে এসে মিস হয়ে যাচ্ছিল তাই ভাবলাম আমাকে দিয়ে হয়তো প্রোগ্রামিং কনটেস্টের কিছু হবে না। আমি তখন মজা জন্যই মূলত এই অনলাইনে প্রোগ্রামিং কনটেস্ট করে যাচ্ছিলাম। ওই সময়ে আমি আরেকটা অনলাইন কনটেস্ট অংশগ্রহণ করেছিলাম সে সময় আমার বাসায় ইলেকট্রিক আইপিএস বা ইউপিএস কিছুই ছিলনা। ইলেক্ট্রিসিটি চলে যাওয়া মানেই হচ্ছে পুরো অন্ধকার কম্পিউটার বন্ধ হয়ে যাওয়া। সে সময় অনলাইন কনটেস্ট চলছে আমি তখন কোড করেছি এখন সাবমিট করব। সাবমিটে জাস্ট ক্লিক করেছি ওই সময় ইলেক্ট্রিসিটি চলে গিয়েছে। তখন আমার যা মনে হলো আমার জীবনের প্রোগ্রামিং কনটেস্ট দিয়ে কিছু হবে না। তারপর আধাঘন্টা পর ইলেকট্রিসিটি আসলো। ইলেকট্রিসিটি আসার পর আমি কম্পিউটার অন করে দেখলাম সাবমিট হয়েছে কি না। পরে দেখলাম সাবমিট হয়ে গিয়েছিল এবং আমি কোয়ালিফাই হয়েছি সেখান থেকে। আমি বলব যে আমার গুগলে যাত্রা শুরু হয়। তারপর ওয়ান-সাইড রাউন্ড শেষ হয়, যা হয়েছিল ইন্ডিয়ার ব্যাঙ্গালোরে। তখন সেখানে যে উপস্থাপক ছিল সে বলে, আগামীকাল সকালে আপনাদের জন্য ইন্টারভিউ এর ব্যবস্থা করা হয়েছে আমি তখন ইন্টারভিউ সম্পর্কে জানি না। হয়তো আগে বলেছিল আমি খেয়াল করিনি। আর তখন আমার হাতে সময় ছিল না যে, আমি প্রিপারেশন নিবো। এত সব চিন্তা না করে আমি রিলাক্স মুডে যাই যে আমার একটা অভিজ্ঞতা হবে মানুষকে বলতে পারব যে গুগোল আমাকে একটা ইন্টারভিউ করেছিল। আমার ইন্টারভিউ ভালো হলো আমাকে যেসব প্রশ্ন করা হয়েছিল। সেগুলো আমার ইন্টারেস্টিং মনে হলো আর আমি যতটুকু পারলাম ভালো মতো উত্তর দিয়ে গেলাম। তারপর আমি সেখান থেকে খুব বেশি কিছু আশা করিনি। আমি সেখানেই আমার সব এক্সপেক্টেশন শেষ করে দেশে ফিরে চলে আসলাম এবং আমার পড়ালেখায় মনোযোগী হলাম। আমার আসলে প্ল্যান ছিল তখন আমি ব্যাচেলার শেষ করে আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পিএইচডির জন্য আবেদন করবো। সেজন্য আমি জিয়ারি দেই রেজাল্টও ভালো হয়। আমি টপ র‍্যাংকিং ছয়টা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির জন্য আবেদন করি এবং ছয়টা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারটা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার এডমিশন কোয়ালিফাই হয়ে যায়া। আমার তখন বাছাই করতে হয় আমি কোনটাতে যাবো। ঠিক সে সময় আমার কাছে গুগল থেকে ইমেইলে অফার আসে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে জয়েন করার জন্য। যেহেতু আমার আগে বাংলাদেশ থেকে গুগোলে চাকরি করবে এরকম আর কেউ যায়নি। সেহেতু অন্য কাউকে দেখে আমি গুগল যাব সেরকম কোনো উপায় ছিল না। তারপর আসলে যেটা হয় বাবা-মা কথাটা জানলো। তখন গুগল কি জিনিস সেটা বুঝতে পারেনি। তারা বলল, তুমি এত ভালো ভালো ইউনিভার্সিটি অ্যাডমিশন পেয়েছো, এখন এই গুগল কথা থেকে আসলো? এটা কী জিনিস? তারপর আমার অনেক চেষ্টা করে তাদেরকে বোঝাতে হয়েছিল, এটা অনেক বড় ব্যাপার এবং ভবিষ্যতে পৃথিবীতে আরো অনেক বড়ো ব্যাপার হবে। আর আমাদের দেশ থেকে কেউ এখন পর্যন্ত কেউ সেই সুযোগ পায়নি। আমি সেই পথে যেতে চাই। আমার সিদ্ধান্তের ওপর তাদের সবসময়ই বিশ্বাস ছিল। সে সময়ও তারা সে বিশ্বাস রেখেছিল এখন তারা খুবই খুশি যে আমি সেইপথ বেছে নিয়েছিলাম।

এনএনও : গুগল থেকে যখন প্রথম অফারটি আসে, আপনি সেইটা সাথে সাথেই কাজে লাগাননি আপনি প্রথমে আপনার পড়াশোনার কাজে ফোকাস করেছিলেন। একটা সাহসের ব্যাপার। যেখানে আপনার আগে কোন বাংলাদেশী যায়নি, সেটাকে আপনি শুরুতেই খুব বেশি গুরুত্ব না দিয়ে আপনার পড়ালেখার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছিলেন সেই বিষয়টি আমরা আপনার কাছ থেকে জানতে চাই।

জাহিদ সবুর : অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করে গুগলের বা বড়ো বড়ো কোম্পানিগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন হয় না। তাহলে আমাদের পড়াশোনা করার কী প্রয়োজন! আমার কাছে মনে হয় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন আছে।আপনি যদি একটি প্লাটফর্মে থাকেন তাহলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আপনাকে সাহায্য করবে আপনি কি এগিয়ে যাচ্ছেন না পিছিয়ে পড়ছেন তা বোঝার জন্য বা আপনি অন্যদের বিচারে কোথায় অবস্থান করছেন। আমি যদি এখন বাসায় বসে পড়ালেখা করি, কখনোই পরীক্ষা না দিই। তাহলে অন্যরা কোন লেভেলে আছে তারা কি আমার থেকে এগিয়ে যাচ্ছে না পিছিয়ে যাচ্ছে কখনও জানতে পারব না। ভালো কথা যে, খুব বড়ো একটা কোম্পানিতে আপনি সুযোগ পেয়ে গেলেন এবং আপনার লাইফ সেট হয়ে গেল। কিন্তু যদি সেটা না হয় তখন আপনি কী করবেন? অথবা আপনি যে সে পদের জন্য যোগ্য, সেটা আপনি কীভাবে প্রমাণ করবেন? সেটা প্রমান করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সাহায্য করবে। তাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা সেই প্ল্যাটফরম তো অবশ্যই আমাদের জন্য বড় একটা সুযোগ। তাই অবশ্যই এটাকে ছোটো করে দেখা আমাদের উচিত না। ঠিক সেই কারণে আমি যখন গুগোলের যোগ দিই তখন আমার মনে হলো, গুগোলে যোগ দেওয়া মানে এটা না যে আমি গুগল সফল হয়ে যাব।।আর অনেকটা সেটাই কিন্তু হয়েছিল, প্রথম তিন মাস যখন আমাকে তারা হায়ার করেছিলেন, আমার খুবই খারাপ একটা সময় কেটেছিল। আমার মনে হচ্ছিল তারা আমাকে হায়ার করে খুব বড়ো একটা ভুল করে ফেলেছে। আমি কোনো কিছুই বুঝতে পারছি না, কোন কিছুতে কন্ট্রিবিউট করতে পারছি না। আমার মনে হচ্ছিল, তিন মাস পর তারা আমাকে ফায়ার করে দেবে, আমি বাসায় ফেরত যাব। ভাগ্যিস! আমি পড়াশোনা শেষ করেছি আমার ডিগ্রি আছে, আমি চাইলেই আমার পিএইচডির ডিগ্রির অফারগুলো কাজে লাগাবো। এ-রকমভাবেই তিন মাস ছিল। তারপর আস্তে আস্তে জিনিসপত্রগুলো বোঝা শুরু করি। সে অবস্থাটা কিন্তু ভিন্ন হতে পারতো! আমি সেখানে ব্যর্থ হতেও পারতাম। তাই পড়াশোনাকে কখনোই অবহেলা করা উচিত না।

এনএনও: আমরা অনেক সময় এ-রকম শুনে থাকি যে, আইটি ফিল্ডে কাজ করতে হলে একদম তুখোড় প্রোগ্রামার হতে হবে। এক্ষেত্রে আপনার মতামতটা কী? প্রোগ্রামিং এক্ষেত্রে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

জাহিদ সবুর : আমি মনে করি একজন মানুষ আসলে যে জিনিসটা পছন্দ করে, সেটাতে সে সফল হতে সক্ষম হয়। ছোটোবেলা থেকেই আমার বায়োলজি পছন্দ ছিল না। এই সময় যদি আমার বাবা চাইতেন যে, আমি বায়োলজি নিয়ে পড়ে বড়ো মাপের একজন ডাক্তার হই। তখন তখন আমি টেনেটুনে অনেক কষ্টে ডাক্তার হয়ে যেতে পারলেও আমি সেই মাপের একজন ডাক্তার কিন্তু কখনো হতে পারতাম না। যতটা আমি ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে হতে পেরেছি। তাই দেখার বিষয়, আপনি প্রোগ্রামিং পছন্দ করেন কি না। আমি বিশ্বাস করি, প্রোগ্রামিং-এ আপনাদের যে দুর্বলতাগুলো আছে সেগুলো চেষ্টা করলে আপনি কাটিয়ে উঠতে পারবেন। আপনার যদি জিনিসটা ভালো লাগে তাহলে সময়ের সাথে সাথে আপনার দুর্বলতাগুলো আসছে আপনি সেগুলো কাটিয়ে তুলতে পারবেন। কিন্তু একটা জিনিস ভালো না লাগলে সময়ের সাথে সাথে সেটা জোর করে পছন্দ করা সম্ভবত সম্ভব না। ব্যাডমিন্টন প্রচন্ড পছন্দ করি, ব্যাডমিন্টন আমার নেশা। আমি কিন্তু বলতে পারি না যে ব্যাডমিন্টন আমি পছন্দ করি না। আমি যদি জীবনে কখনো ব্যাডমিন্টন না-ই খেলতাম, আমি কিন্তু বলতে পারতাম না যে আমি পছন্দ করি না। তেমনি প্রোগ্রামিং কিছুটা সময় দিতে হবে, বুঝতে হবে, চেষ্টা করতে হবে। তারপর যদি আপনার প্রোগ্রামিং ভালো না লাগে, তাহলে আমার মনে হয় আপনার কখনোই প্রোগ্রামিং না করাটা আমার মনে হয় ভালো। কারণ যা চেষ্টা করেও ভালো লাগেনা, তা করে আমরা সুখী হতে পারি না আর শেষ পর্যন্ত আমরা করলেও কতটুকু সফল হবো, সেটা বলা যায় না। কিন্তু আমি মনে করি, প্রোগ্রামিং খুব সুন্দর একটা জিনিস। কেউ যদি চেষ্টা করে, যথেষ্ট সময় দেয় তাহলে প্রচুর সম্ভাবনা আছে যে তাদেরই জিনিসটা ভালো লাগবে।

এনএনও: বাংলাদেশি তরুণরা কীভাবে নিজেদেরকে গুগোল এ কাজ করার জন্য প্রস্তুত করে তুলতে পারে?

জাহিদ সবুর : এখানে অনেকগুলি স্টেপ আছে। আপনি এখন সে স্টেপের কোন পর্যায়ে আছেন সেটার ওপর নির্ভর করবে, আপনি কোথা থেকে শুরু করবেন। ধরুন, আমি একদম শুরু থেকে শুরু করি। যেখানে আপনি এখন স্কুলে পড়াশোনা করছেন। স্কুলে পড়াশোনাকালীন আপনি যা-ই করুন না কেন আপনি একটা চিন্তা মাথার মধ্যে যোগ করে নিতে পারেন, কীভাবে আপনি একটা রিজেউম তৈরি করবেন যা দেখেই মানুষ জন বলতে পারবে আপনি আশেপাশের মানুষগুলোর চেয়ে বেশি যোগ্য। সেটা কিন্তু নানানভাবে আপনি তৈরি করতে পারেন, নানান রকম কম্পিটিশন হয় সেগুলোতে আপনি যোগ দিতে পারেন, আপনি নতুন কিছু তৈরি করতে পারেন। প্রথম পর্যায়ের আপনি আরও একটা কাজ করতে পারেন তা হলো আপনি পড়ালেখায় ভালো রেজাল্ট করতে পারেন, এটাও কিন্তু প্রমাণ করে যে, আপনি বাকিদের চাইতেও যোগ্য। দ্বিতীয় পর্যায়ে চলে আসি, আপনার স্কুল লাইফ শেষ এখন ইউনিভার্সিটিতে এসেছেন এখন আপনি কী করতে পারেন? এখানেও আমরা যে জিনিসগুলো করে এসেছি সে জিনিসগুলোই করবো। এখানে আমাদের সুযোগের পরিধিগুলো আরো বেড়ে গেছে। এখন আপনি আপনি আরো বেশি কিছু করতে পারেন। আপনি প্রোগ্রামিং কম্পিটিশনে যোগ দিতে পারেন, আপনি ওপেনসোর্স নিয়ে কাজ করতে পারেন, আপনি পড়াশোনা ভালো করতে পারেন, ভালো সিজিপিএ ধরে রাখার চেষ্টা করতে পারেন, এভাবে আপনি বিভিন্ন প্লাটফরমেই কাজ করতে পারেন। সবসময় একটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে, কীভাবে আপনি আপনার রেজিউমে এমন করবেন যেটা আপনাকে বাকিদের চেয়ে বেশি যোগ্য বলে প্রমাণ করে। এখন ধরুন, আপনি এমন একটা রেজিউমে তৈরি করে ফেলেছেন যা প্রমাণ করে আপনি বাকিদের চাইতে যোগ্য। এখন আপনাকে গুগল বা অন্যান্য বড়ো কোম্পানিতে যেখানে তাদের জব সাইট আছে, সেখানে গিয়ে দেখবেন যে জব ওপেনিংগুলো আছে সেগুলোর মধ্যে কোনটা আপনার পছন্দ সেগুলোর সাথে মিলে যাচ্ছে। সেখানে আপনি রিকোয়ারমেন্টগুলো দেখবেন, খুবই সম্ভব আপনার যে যোগ্যতা আছে তার সাথে রিকোয়ারমেন্টগুলো ম্যাচ করে যাবে। গুগল চায়, সবাই যেন এপ্লাই করতে পারে তাই রিকোয়ারমেন্ট গুলো খুবই ফ্লেক্সিবল রাখে। মনে রাখতে হবে, এটা কিন্তু এপ্লাই করার যোগ্যতা। তার মানে এই না যে, এই যোগ্যতা যাদের আছে, তাদের সবাইকে গুগলে নিয়োগ করা সম্ভব হবে। তারপর আপনি সেখানে এপ্লাই করলেন। তারপর আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে যে, গুগল থেকে রিকুয়েটর বা কেউ আপনার সাথে কন্টাক্ট করবে। সেখান থেকে তারা আপনার সাথে কথা বলবে, আপনার যোগ্যতাগুলো যাচাই করবে এরপর যদি তাদের মনে হয় নেক্সট স্টেপে যাওয়া যায়, তাহলে তারা ইন্টারভিউর ব্যবস্থা করবে। এক্ষেত্রে কয়েকটি পর্যায় অবলম্বন করে ইন্টারভিউ হবে। তারপরে হয়তো আপনি অফার পাবেন। এগুলো হচ্ছে আপনার দিক থেকে আপনি যে প্রচেষ্টাগুলো দেখতে পাচ্ছেন। এখন ভিন্ন দিকটাও আমি একটু বলতে চাই এই কারণে যাতে আপনাদের বুঝতে সুবিধা হয় প্রসেসটা কীভাবে কাজ করে। আমি এখানে আপনাকে বলে দিতে পারি চার আর পাঁচ যোগ করে নয় হয়। এটা আপনি মনে রাখতে পারেন। সেটা আপনার খুব একটা কাজে আসবে না। আপনার যেটা বুঝা দরকার, চার আর পাঁচ যোগ করলে কী হয় সেটা আপনি নিজে পারেন কি না। যদি আপনি সেই প্রসেসটা বুঝতে পারেন তাহলে আপনার সাথে সেটা আপনি মানিয়ে নিতে পারবেন। লক্ষ লক্ষ প্রার্থী আবেদন করতে পারে। কোম্পানিগুলোর অবশ্যই সম্ভব না যে, লক্ষ লক্ষ প্রার্থী সবাইকে নিয়োগ করা। এক্ষেত্রে গুগল প্রথমত আপনার রেজিউমেটা দেখবে। দেখে তারা সিদ্ধান্ত নেবে এই প্রার্থীগুলো যোগ্য। তারপরে আপনার ইন্টারভিউ হবে। কোনো ইন্টারভিউতে আপনি সাকসেস হলে আপনার ওয়ান-সাইড ইন্টারভিউ নেওয়ার হবে। তারপর হায়ারিং কমিটির রিকমেন্ডেশনের ওপর ভিত্তি করে সেই প্রার্থীকে নিয়োগ করা হয়। এখন আপনার মিলিয়ে নিতে হবে প্রতিটি পদের সফল হওয়ার জন্য আপনার কী করতে হবে।

এনএনও: গুগল কি স্টুডেন্টদের জন্য কোন পার্টটাইম জব/ ইন্টার্নশিপ অফার করে ?

জাহিদ সবুর : হ্যাঁ, গুগল ইন্টার্নশিপ অফার করে। আমাদের নানা ধরনের ইন্টার্নশিপ অফার রয়েছে বাংলাদেশিদের জন্য। যেটা সমস্যা হচ্ছে, তা হলো ওয়ার্কিং ভিসা। ওয়র্কিং ভিসা পেতে বাংলাদেশিদের খুবই অসুবিধা হয়ে যায়।

এনএনও: বিভিন্ন ধাপ পার করে আপনি গুগলের যে ২৫০ জন্য ডিরেক্টর রয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন। এতে আপনার দায়িত্ব যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি আপনার ভালো লাগা জায়গাটা রয়েছে। এইদিকটা আপনার কাছ থেকে জানতে চাই।

জাহিদ সবুর : পরিচালক হওয়াটা এতটা কঠিন না। এক্ষেত্রে আপনার টিমের যে সাইজ, মানে হচ্ছে আপনার টিমে কতজন লোক কাজ করে তাদের সংখ্যাটাই মূলত নির্ভর করে। কিন্তু প্রেস কো ইঞ্জিনিয়ার হওয়াটা শুধুআপনার কাজের ওপর অর্থাৎ আপনার যোগ্যতার উপর নির্ভর করে। গুগলে গিয়ে প্রথমেই লক্ষ্যটা ছিল মূলত টিকে থাকা। প্রথম তিন মাস আমি শুধু টিকে থাকার চেষ্টা করেছি। এরপর যখনই একটু বুঝতে পারলাম তখন এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। আমি সবসময় নিজেকে একটা ক্লাসে ১০০-২০০ জন স্টুডেন্ট থাকলে নিজেকে প্রথম সারির কয়েকজন হিসেবে মনে করতাম। কিন্তু গুগলে গিয়ে বুঝতে পারলাম আমার আশেপাশে যারা আছে তারা কোনো অংশে আমার থেকে কম না। তাই আমি প্রচুর পরিশ্রম করতাম। কারণ আমি জানতাম এই পরিশ্রমটাই একমাত্র জিনিস যার মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে এগিয়ে থাকতে পারবো। আমাদের গুগলের প্রসেস অনুযায়ী দুবার প্রমোশনের জন্য এপ্লাই করা যেত। আমি সবসময় প্রস্তুত হয়ে সেখানে এপ্লাই করতাম। এভাবে একেকটা ধাপ অতিক্রম করতে থাকি এবং আমার কনফিডেন্স লেভেল আরো বাড়তে থাকে। আর আমি কখনোই প্রস্তুতি না নিয়ে কখনোই প্রমোশনের জন্য এপ্লাই করতাম না। তাই এমন কখনো হয়নি যে আমি এপ্লাই করেছি কিন্তু আমার প্রমোশন হয়নি।

এনএনও: আপনার শিক্ষাগত সময় থেকে শুরু করে আপনাকে বিশাল পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। এই সময়টাতে আপনার পাশে নিরলসভাবে কে ছিল?

জাহিদ সবুর : আমি বলব প্রথমত, আমার মা অবশ্যই। আমার বাবাও কিন্তু আমার মা যেভাবে আমার পিছনে লেগে ছিলেন! লেগে ছিলেন বলতে এটা নেগেটিভলি না, আমার মা সবসময় আমাকে উৎসাহ দিয়ে গেছেন, উদ্দীপনা দিয়ে গেছেন, কোনো কিছুতে আমি হেরে গিয়েছি, তখন সেটা কীভাবে কাটিয়ে উঠব, সেই বিষয়ে তিনি আমাকে সহায়তা করেছেন।

এনএনও: ভার্সিটি লাইফে আপনি আপনার সিজিপিএটা মেনটেইন করলেন কিভাবে?

জাহিদ সবুর : ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পূর্ব সময়কালীন আমার কাছে একটা খাদের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকার মতো অবস্থা ছিল। ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে আমার মধ্যে একটাই লক্ষ্য ছিল, আমি কীভাবে একটা ভালো স্কলারশিপ পেতে পারি। স্কলারশিপ পেলে পড়ালেখার খরচ খরচ বহন করা সম্ভব হবে। এজন্য আমি কখনোই পড়ালেখা গাফিলতি করিনি এজন্য আমার ভালো সিজিপিএ অর্জন হয়েছে।

এনএনও: ডাক্তার বা অন্য কোনো পেশা থেকে বা বিজনেস থেকে কি গুগোল এ জয়েন করা সম্ভব কি না?

জাহিদ সবুর: গুগল মূলত ইঞ্জিনিয়ারদের দ্বারা চালিত একটি কোম্পানি। ডাক্তাররাও এখানে কাজ করে। তবে আমি বলব যে আপনি আপনার ফিল্ডে খুঁজে দেখবেন যে আপনি কোন কোম্পানিতে গেলে সবচেয়ে বেশি ইম্প্যাক্টফুলভাবে কাজ করতে পারবেন।

এনএনও : আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, ভাইয়া। আমাদেরকে সময় দেওয়ার জন্য।

জাহিদ সবুর : হ্যাঁ, আপনাদেরকেও ধন্যবাদ। আমাকে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার জন্য।

1 COMMENT

Comments are closed.

Latest article