এইচএসসি পরীক্ষা ২০২২: কতটুকু প্রস্তুত পরীক্ষার্থীরা

Must read

২০২০ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরপরই দেশে প্রথম করোনা শনাক্ত হয়, মার্চে বন্ধ ঘোষণা করা হয় দেশের সকল পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। করোনা সংক্রমণের ভয়াবহ পরিস্থিতিকে উপেক্ষা করে মে মাসে এসএসসি ও সমমানের ফলাফল প্রকাশ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ফলাফল প্রকাশের কয়েক মাস পর শুরু হয় কলেজে ভর্তির আবেদন প্রক্রিয়া, শেষ হয় সেপ্টেম্বরে। করোনা সংক্রমণ উর্ধ্বমুখী থাকায় কলেজে ভর্তি হয়েও সশরীরে ক্লাস করার সুযোগ হয়নি শিক্ষার্থীদের। অনলাইনে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালিত হলেও যথেষ্ট সুযোগ সুবিধা না থাকায় বঞ্চিত হয়েছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অধিকাংশ শিক্ষার্থী।

দীর্ঘ সময় পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে ২০২১ সালে শুরু হয় এসাইনমেন্ট কার্যক্রম। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে কলেজ ক্যাম্পাসগুলোতে কিছুটা প্রাণ ফিরে পেলেও সশরীরে ক্লাস করতে না পারার আক্ষেপ দেখা যায় শিক্ষার্থীদের মাঝে। এসাইনমেন্ট কার্যক্রম শুরুর কয়েক মাস পর ৩০% সিলেবাস কমিয়ে সংক্ষিপ্ত সিলেবাস প্রকাশ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সিলেবাস সংক্ষিপ্তকরণ নিয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছে প্রশ্নের ছড়াছড়ি। অর্থাৎ এসএসসি ২০২২ ব্যাচের জন্য শুরু থেকে এখন পর্যন্ত নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপ কতটা যৌক্তিক এবং উপযোগী ছিলো, পদক্ষেপগুলো ভবিষ্যতে তাদের ওপরে প্রভাব ফেলবে কিনা! এ-নিয়ে মতামত জানিয়েছে এইচএসসি ২২ ব্যাচের তিন কলেজ শিক্ষার্থী।

ফাহিমা আহমেদ শিফা,
শিক্ষার্থী, ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ

সঠিক সময়ে কলেজে ভর্তি না হতে পেরে আমাদের শারীরিক-মানসিক উভয় দিকে একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এবং ভবিষ্যতেও পড়বে। আমাদের স্কুল জীবন সুদীর্ঘ দশ বছরের সেখানে কলেজ জীবন মাত্র দুই বছরের। আমরা এইচএসসি ২০২২ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা কলেজ জীবনের এক বছরও সশরীরে ক্লাস করার সুযোগ পাচ্ছি না। সশরীরে ঠিকমতো ক্লাস শুরু হতে হতে পার হয়ে যায় অনেকগুলো দিন, যা অবশ্যই আমাদের ২২ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

পরবর্তীতে ৩০% সিলেবাস কমিয়ে সংক্ষিপ্ত সিলেবাস প্রকাশ করা হয়েছে যার যৌক্তিকতা কীভাবে বর্ণনা করব তা আদৌ বুঝতে পারছি না। বর্তমানে ৭০% সিলেবাস শেষ করার লক্ষ্যে প্রতিদিন দুটি তিনটি করে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে, যা অপ্রতুল। হয়তো সিলেবাস কমাতে হবে নয়তো ক্লাসের সংখ্যা বাড়াতে হবে। অন্যথায় এই সিলেবাস সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। আমাদের কলেজ জীবনের পরে বিশাল একটা যুদ্ধ করতে হয় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার জন্য। সেই যুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে আমাদের প্রত্যেকেরই অনেক বেশি পড়ালেখা করতে হয়, অনেক বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে হয়।

এইচএসসিতে সিলেবাস কমানো হলেও ভর্তি পরীক্ষার সিলেবাস কমানো হচ্ছে না। আবার সিলেবাস কমানো হবে কী হবেনা তার একটা দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে আমরা ভুগছি। কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না যার কারণে আরো বেশি সমস্যা হচ্ছে। তাছাড়া এমন ভাবে সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে যে, একটি অধ্যায়ের সাথে পরবর্তী অধ্যায়ের যোগসূত্র রয়েছে। সেক্ষেত্রে আমাদের বাদ দেওয়া অধ্যায়গুলোও পড়তে হচ্ছে। অবশেষে দেখা যাচ্ছে যে, সিলেবাস সংক্ষিপ্তকরণ কোনো কাজে আসছে না।

অ্যাসাইনমেন্ট কার্যক্রমের মাধ্যমে আমাদের লেখার চর্চা হয়েছে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে অ্যাসাইনমেন্ট কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের জন্য কিছুটা উপকার হয়েছে।

এছাড়া আমার মতে স্কুল-কলেজ আগেই খুলে দেওয়া উচিত ছিল তাহলে হয়ত আমরা এতটা পিছিয়ে থাকতাম না। কারণ তখন দেখা গিয়েছে যে, বাহিরে অন্যান্য যানবাহন, মানুষের যাতায়াত সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল কিন্তু শুধুমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। তবে বর্তমানে ওমিক্রনের প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। এমতাবস্থায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ যুক্তিসঙ্গত। অনেকটাই খারাপ অবস্থা এখন।

দেওয়ান শৈশব,
শিক্ষার্থী, বি এ এফ শাহীন কলেজ

দীর্ঘ সময় কলেজ বন্ধ থাকাটা আমাদের ২২ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের উপর একটি বড় প্রভাব ফেলবে। কারণ আমরা সিলেবাস সম্পন্ন করতে যে সময় পাচ্ছি সেই সময়ের ভিতরে প্রস্তুতি নেওয়া অনেকটাই কঠিন। অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে আমরা রাজধানীর শিক্ষার্থীরা কিছুটা হলেও সাপোর্ট পেয়েছি কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা সেই সাপোর্ট পায়নি। সুতরাং সেদিক থেকে বিবেচনা করলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা।

তাই সঠিক সময়ে কলেজে ভর্তি হতে না পারা এবং সশরীরে ক্লাস করতে না পারা আমাদের উপর একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এছাড়া সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করণের বিষয়টি আমাদের কাছে হাস্যরসাত্মক মনে হয়েছে। সিলেবাস যদি কমানোর দরকার হয় তাহলে সারা বাংলাদেশের সকল শিক্ষার্থীর কথা মাথায় রেখে এটি কমানো উচিত। আমরা যে স্বল্প সংখ্যক ক্লাস পাচ্ছি সে তুলনায় নামমাত্র সিলেবাস কমানো হয়েছে।

অ্যাসাইনমেন্ট বিতরণ কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের কিছুটা হলেও উপকারে এসেছে কারণ ওই সময়ে আমাদের কলেজ বন্ধ ছিল যার ফলে পড়ালেখার অবস্থা খুবই খারাপ ছিলো। তাই অ্যাসাইনমেন্ট বিতরণের সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক বলে মনে হয়েছে। তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিজ মেধার উপর অ্যাসাইনমেন্ট সম্পূর্ণ করেনি, বিভিন্ন জায়গা থেকে অ্যাসাইনমেন্ট গুলো সংগ্রহ করে লিখেছে যা মোটেও কাম্য ছিলো না।

পরবর্তীতে সকল জল্পনা কল্পনা ছাপিয়ে স্কুল কলেজ খুলে দিলেও আমাদের ২২ ব্যাচের ৭০% সিলেবাস সম্পন্ন করতে যে পরিমাণ ক্লাস বরাদ্দ করা হয়েছে তাতে কোনোভাবেই যথাসময়ে প্রস্তুতি গ্রহণ করা সম্ভব নয়। ক্লাসের সংখ্যা বাড়ানো উচিত অথবা পরীক্ষার সময় পেছানো উচিত।

আমরা গ্রুপভিত্তিক পরীক্ষা চাই না , সবগুলো বিষয়ে পরীক্ষা হলে আমাদের সুবিধা হবে। কারণ সবগুলো বিষয়ে পরীক্ষা হলে মূল্যায়নটা সঠিকভাবে হবে এবং এর প্রভাব আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি যুদ্ধে পড়বে না। প্রয়োজনে পরীক্ষাগুলোর মূল্যায়ন ৫০% কলেজ এবং ৫০% বোর্ড পরীক্ষার মাধ্যমে করা হোক। কিন্তু পূর্ববর্তী বোর্ড পরীক্ষার উপর ভিত্তি অর্থাৎ জেএসসি, এসএসসি এর রেজাল্টের উপর ভিত্তি করে মূল্যায়ন করা সঠিক হবে না।

বর্তমানে যেহেতু ওমিক্রনের সংক্রমণ অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পাচ্ছে তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত সঠিক বলে মনে করছি। কারণ জীবনের মূল্য সব থেকে বেশি। তবে পরবর্তীতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার নির্দেশনা আসলে ক্লাস সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।

নুসরাত জাহান নওশীন,
শিক্ষার্থী, গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট কলেজ

২০২০ সালে বাংলাদেশে করোনা নামক অতিমারি শিক্ষার্থীদের উপর একটি ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। আকস্মিক পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের উপর একটি মানসিক চাপ সৃষ্টি করেছে। তাই বলা যায়, শুধুমাত্র এইচএসসি ২২ ব্যাচ নয় বরং সমগ্র পৃথিবীর শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি হয়েছে।

অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শ্রেণি কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও যথেষ্ট সুযোগ সুবিধার অভাবে বঞ্চিত হয়েছে অধিকাংশ শিক্ষার্থী। তাছাড়া এসাইনমেন্ট কার্যক্রমও শিক্ষার্থীদের জন্য তেমন কোনো উপকারে আসেনি বলে আমি মনে করি।

তবে শিক্ষার্থীদের মোটামুটি একটি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অর্থাৎ নিয়মিত পাঠ্যবই পরিচর্যা সচল রাখবার একটি ভালো কৌশল ছিল। কিন্তু এসাইনমেন্ট কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের জন্য আরও বেশি কার্যকরী প্রভাব ফেলতে পারতো যদি এসাইনমেন্টের প্রশ্নসূচী সম্পূর্ণই সৃজনশীল চেতনাধর্মী হতো এবং সামাজিক মাধ্যমে এসব এসাইনমেন্টের উত্তরপত্র প্রচার নিষিদ্ধ করা হতো। এতে করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি ব্যাপক শিক্ষার এবং শেখার ব্যাপক ব্যবধান রয়ে গেছে। শ্রেণি শিক্ষক এবং বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকগণ যদি এই এসাইনমেন্ট কার্যক্রমের প্রতি আরো বেশি সচেতন হতেন এবং গুরুত্ব প্রদান করতেন তবেই এসাইনমেন্ট কার্যক্রমের যথার্থ মূল্যায়ন হতো।

করোনা পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে এইচএসসি ২২ ব্যাচের পরীক্ষার্থীদের জন্য ৭০% সিলেবাস পাঠ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই করোনাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক, আর্থিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে সিলেবাস সংক্ষিপ্তকরণের বিষয়টিকে সমর্থন করছি। করোনার কারণে আমাদের পড়াশোনার ব্যাপক ঘাটতি পরে গিয়েছিল। তাই এই আংশিক সিলেবাস পাঠ্য করায় আমরা অনেকটা উপকৃত হয়েছি।

তবে ৭০% সিলেবাস শেষ করার জন্য প্রতিদিন ২/৩ টি ক্লাস যথেষ্ট নয়। বিজ্ঞান বিভাগে একটি ব্যাপক সিলেবাস রয়েছে এবং দুইটি পত্রের পাঠ্যপরিকল্পনা বিস্তর। সুতরাং ৩০% সিলেবাস কমিয়ে দিলেও প্রতিটি অধ্যায় একটি অপরটির সাথে সম্পৃক্ত থাকায় সংক্ষিপ্ত সিলেবাস তেমন একটি কাজে আসবে না। ২০২২ সালের এইচএসসি পরীক্ষার সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করলেও এখনো চূড়ান্ত তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। তাই প্রতিদিন অন্তত ৪-৫ টি ক্লাস ৪৫ মিনিট করে পাঠ পরিকল্পনার সময়সূচি গৃহীত হলে আমাদের জন্য সুবিধা হবে।

 

Latest article